মা ও ভাগনের সঙ্গে নিভে গেল জাবির স্বপ্নবাজ রাইয়ানের প্রাণ

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬ , ১২:২৩ পিএম


মা ও ভাগনের সঙ্গে নিভে গেল জাবির স্বপ্নবাজ রাইয়ানের প্রাণ
ছবি: সংগৃহীত

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট— একটি ব্যস্ত নদীপথ, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের যাতায়াতের কেন্দ্র। অথচ সেই ঘাটই বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে পরিণত হলো এক বিভীষিকাময় মৃত্যুকূপে। বাসডুবির মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ঝরে গেল বহু তাজা প্রাণ। তাদেরই একজন আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান— একজন স্বপ্নবাজ তরুণ, মেধাবী শিক্ষার্থী, সচেতন সমাজকর্মী; যার জীবনের আলো নিভে গেল হঠাৎই, নির্মমভাবে।

বিজ্ঞাপন

ঈদের ছুটি কাটিয়ে পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন রাইয়ান। সঙ্গে ছিলেন তার মা রেহানা আক্তার, চিকিৎসক বোন ডা. নুসরাত জাহান খান এবং আদরের ভাগনে, মাত্র আট বছরের ছোট্ট তাজবিদ। কিন্তু সেই ফেরা আর ফেরা হলো না। দৌলতদিয়া ঘাটে পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সোজা তলিয়ে যায় পদ্মার গভীর জলে— মুহূর্তেই সবকিছু অন্ধকার।

রাইয়ান ও তার মা এবং ছোট্ট তাজবিদ আর ফিরে আসেননি। বেঁচে ফিরেছেন কেবল বোন নুসরাত, কিন্তু তার চোখে এখন অসীম শূন্যতা— একসঙ্গে হারিয়েছেন মা, ভাই ও সন্তানকে।

বিজ্ঞাপন

আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। মেধা, মনন আর যুক্তির দীপ্তিতে তিনি ছিলেন সহপাঠীদের মধ্যে আলাদা করে চেনা এক নাম। স্কুলজীবন থেকেই বিতর্কচর্চায় জড়িত ছিলেন; জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে কুড়িয়েছেন সাফল্য। বিশ্ববিদ্যালয়েও যুক্ত ছিলেন বিতর্ক আন্দোলনে— যুক্তির আলোয় সমাজকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তার।

শুধু পড়াশোনা নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধেও ছিলেন এগিয়ে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা সামাজিক উদ্যোগে সক্রিয় ছিলেন রাইয়ান। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া— এসবই ছিল তার জীবনের অংশ। বন্ধুবান্ধব ও সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার এক নাম।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সেই স্বপ্নবাজ তরুণের জীবন থেমে গেল এক নিমিষে।

দুর্ঘটনার রাতেই মরদেহগুলো পৌঁছে দেওয়া হয় বাড়িতে। পুরো বাড়িজুড়ে তখন শুধু কান্নার শব্দ, স্বজনদের আহাজারি আর অসহায় শোক। কিছুদিন আগেই গত ডিসেম্বর মাসে বাবাকে হারিয়েছিল পরিবারটি। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার এমন নির্মম আঘাত— যেন একের পর এক দুঃখের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তাদের জীবনে।

বিজ্ঞাপন

রাজিয়া নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ক্লাস ফাইভ থেকে আমরা একসঙ্গে বিতর্ক করেছি। রাইয়ান ভাই সবসময় বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। এমন একজন মানুষকে হারিয়ে আমরা বাকরুদ্ধ। এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি অব্যবস্থাপনার নির্মম ফল।

রাজবাড়ী ডিবেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক উদ্দিন বলেন, রাইয়ান ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও সম্ভাবনাময়। সে অর্থনীতিবিদ হতে চেয়েছিল। সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে খুবই সক্রিয় ছিল। তার এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।

আরও পড়ুন

একটি সম্ভাবনাময় জীবন, একটি পরিবারের স্বপ্ন— সবকিছুই যেন মুহূর্তেই থেমে গেল দৌলতদিয়ার পানিতে। রাইয়ানের মতো আরও অনেকেই হারিয়ে গেছেন তাদের অদেখা ভবিষ্যৎ, অসমাপ্ত স্বপ্ন নিয়ে।

এই দুর্ঘটনা এখন শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, পুরো এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে গভীর বিষাদের ছায়া। মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— এই মৃত্যু কি এড়ানো যেত না?

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে, নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। কারণ, আর কোনো রাইয়ানের স্বপ্ন এভাবে নিভে যাক— এটা কেউই দেখতে চায় না।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission